
সাত সাহেবের বিবি: খুনের কিংবদন্তি, না ইতিহাসের বিকৃতি? চুঁচুড়ার আয়েশবাগে ২১৭ বছরের সমাধি ঘিরে চাঞ্চল্যকর সত্য কপি ও ছবি।
Bengal icon news , হুগলি:চুঁচুড়ার আয়েশবাগের নির্জন প্রান্তে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাদা রঙের আট-কোনা এক সমাধিসৌধ। গম্বুজ, খিলান আর স্তম্ভে সাজানো স্থাপত্যটি দূর থেকে ছোট্ট প্রাসাদের মতো দেখায়। কিন্তু এই সমাধিকে ঘিরেই প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার অন্যতম আলোচিত কিংবদন্তি—'সাত সাহেবের বিবি' সুস্যানা আন্না মারিয়া ভেরকেরের গল্প। জনশ্রুতি বলেছে, তিনি নাকি সাতজন ইউরোপীয় স্বামীকে একে একে বিয়ে করেছিলেন, আর প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছিল রহস্যজনকভাবে। কিন্তু পুরনো দলিল, চার্চের রেজিস্টার ও উইল খুলে দিচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইতিহাস।
ঐতিহাসিক নথি বলছে, সুস্যানার জীবনে স্বামী ছিলেন মাত্র দু'জন—পিটার ব্রুইস এবং থমাস ইয়েটস। অর্থাৎ সাত স্বামীর রোমাঞ্চকর কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজও মেলেনি। বরং লোককথাই সময়ের সঙ্গে ইতিহাসকে ঢেকে দিয়েছে।
অষ্টাদশ শতকে চুঁচুড়া ছিল ওলন্দাজদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। সেই সময়ের এক বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ওলন্দাজ পরিবারেই জন্ম সুস্যানা আন্না মারিয়া ভেরকেরের। তাঁর প্রথম বিয়ে হয় চুঁচুড়ার ওলন্দাজ প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী পিটার ব্রুইসের সঙ্গে। তাঁদের তিন সন্তান—দুই মেয়ে সুস্যানা জ্যাকোবা, মারিয়া আন্না এবং ছেলে লুই আদ্রিয়ান। ১৭৮৩ সালে পিটার ব্রুইসের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সুস্যানার কোনও অপরাধমূলক যোগসূত্রের প্রমাণ ইতিহাসে নেই।
এরপর ১৭৯৫ সালের ৩০ মার্চ কলকাতার সেন্ট জনস চার্চে সুস্যানার দ্বিতীয় বিয়ে হয় ইংরেজ ব্যবসায়ী থমাস ইয়েটসের সঙ্গে। ইয়েটসেরও মৃত্যু হয় সুস্যানার আগে। এখানেই শেষ তাঁর নথিভুক্ত বৈবাহিক ইতিহাস।
তাহলে 'সাত সাহেবের বিবি' নাম এল কোথা থেকে? স্থানীয় লোকমুখে সুস্যানার সমাধিকে ঘিরে ধীরে ধীরে তৈরি হয় সাত স্বামীর রহস্যময় মৃত্যুর গল্প। সময়ের সঙ্গে সেই কাহিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, বাস্তব ইতিহাস প্রায় আড়ালেই চলে যায়।
বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে ফ্লোরিস কাপ-এর নাম। কোথাও কোথাও তাঁকে সুস্যানার তৃতীয় স্বামী বলা হলেও পারিবারিক নথি জানাচ্ছে, তিনি ছিলেন সুস্যানার মা আদ্রিয়ানা রাতসের স্বামী—অর্থাৎ সুস্যানার সৎপিতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল সামনে আসে সুস্যানার ১৮০৫ সালের ২১ নভেম্বরের উইলে। সেখানে তিনি নিজের সম্পত্তির বড় অংশ ছেলে লুই আদ্রিয়ানের নামে রেখে যান। পাশাপাশি ৪,০০০ টাকা দিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশ দেন, যাতে সেই অর্থের সুদে তাঁর নিজের সমাধি এবং দুই স্বামীর সমাধির রক্ষণাবেক্ষণ হয়। অতিরিক্ত অর্থ দরিদ্র মানুষের সাহায্যে ব্যয় করার নির্দেশও ছিল। যে নারীকে লোককথা ধারাবাহিক মৃত্যুর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে, তাঁর নিজের নথিই বরং মানবিকতার অন্য ছবি তুলে ধরে।
১৮০৯ সালের ১২ মে সুস্যানার মৃত্যু হয়। তাঁকে তালডাঙার আয়েশবাগে সমাধিস্থ করা হয়। তখন প্রায় ৬০ বিঘা জমির বিস্তীর্ণ সম্পত্তি ছিল সেখানে। পরে ১৮২৪ সালে ওলন্দাজরা ভারতের বাণিজ্যকেন্দ্র ব্রিটিশদের হাতে ছেড়ে দিলে মালিকানার বদল ঘটে। ১৮৩৩ সালে বিক্রি হয়ে যায় আয়েশবাগের জমি। বাড়ি হারিয়ে গেলেও টিকে থাকে সাদা আট-কোনা সমাধিসৌধটি। বর্তমানে তার পাশেই রয়েছে টেকনো ইন্ডিয়ার পরিচালনায় নেতাজি সুভাষ ইউনিভার্সিটি অফ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ।
চুঁচুড়ার এই কিংবদন্তি পরে পৌঁছে যায় বিশ্বসাহিত্য ও সিনেমায়। রুস্কিন বন্ড লেখেন Susanna's Seven Husbands, আর সেই কাহিনি অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজ ২০১১ সালে নির্মাণ করেন '৭ খুন মাফ'। সুস্যানার চরিত্রে অভিনয় করেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। তবে সেই চরিত্র ছিল লোককথা ও কল্পনার নির্মাণ—ঐতিহাসিক সুস্যানা নন।
ফলে আয়েশবাগের এই সমাধিসৌধের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো খুনের নয়; বরং ইতিহাসকে কীভাবে লোকবিশ্বাস, সাহিত্য ও সিনেমা বদলে দেয়, তারই এক জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে চুঁচুড়ার 'সাত সাহেবের বিবি'র সমাধি।