
*মায়াজালে বাঁধা পুরনো বাড়ির গল্প, নিজেদের হাতেই পুজোর মণ্ডপ—খাঁটোরা পঞ্চাননতলায় থিমে এবার ‘মায়াজাল’*
Bengal icon news , হাওড়া: ডোমজুড়ের খাঁটোরা পঞ্চাননতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার পা দিল ১৭ বছরে। আর ১৭তম বর্ষে পাড়ার পুজোয় নতুন আকর্ষণ ‘মায়াজাল’। কোনও নামী শিল্পী বা পেশাদার সংস্থার হাতে নয়, বাঁশ বাঁধা থেকে শুরু করে মণ্ডপের শেষ আঁচড়—সবটাই নিজেদের হাতে তৈরি করছেন খাঁটোরা পঞ্চাননতলা সেবা সমিতির সদস্যরা। তাই এই পুজো তাঁদের কাছে শুধুই উৎসব নয়, যেন নিজেদের ঘরের পুজো। এবারের মণ্ডপ ভাবনায় উঠে আসছে পুরনো বাড়ির আবহ। মণ্ডপের সামনে থাকছে পুরনো বাড়ির আদলে তৈরি পাঁচিল। আর সেই পাঁচিলের উপরেই যেন সময়ের সঙ্গে জমে থাকা বিশাল এক মাকড়সার জাল। সেই জাল থেকেই তৈরি হবে রহস্যময় ‘মায়াজাল’-এর আবহ। মণ্ডপের ভিতরেও থাকছে নানা চমক। বাঁশ, ত্রিপল, শোলা-সহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে নিজেদের ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিচ্ছেন ক্লাবের সদস্যরাই। গত কয়েক বছর ধরেই নিজেদের হাতে থিমের মণ্ডপ তৈরি করে দর্শকদের মন জয় করে আসছেন তাঁরা। তাই পুজোর আগে মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা তাঁদের কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, একসঙ্গে নতুন কিছু গড়ে তোলার আনন্দ। দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁদের প্রতি বছর আরও নতুন কিছু করার উৎসাহ জোগায়। থিমের মণ্ডপের পাশাপাশি দেবীর রূপে থাকছে সাবেকিয়ানার ছোঁয়া। একচালার সাবেকি প্রতিমায় পুজিত হবেন মা দুর্গা। শিল্পী দিলীপ পাল টানা ১৭ বছর ধরে এই পুজোর প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। ফলে প্রতিমার সঙ্গে উদ্যোক্তা ও এলাকার মানুষের সম্পর্কও যেন পারিবারিক। নিষ্ঠা ও নিয়ম মেনেই ঘরের পুজোর মতো করে দেবীর আরাধনা করা হয় এখানে। মণ্ডপের পাশাপাশি আলোকসজ্জাতেও থাকছে নতুন ভাবনা। পুজোর উদ্বোধনের দিন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি এলাকার শিল্পীদের নিয়েও থাকবে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফলে শারদ উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে যাবে স্থানীয় শিল্প-সংস্কৃতির স্বাদ। খাঁটোরা পঞ্চাননতলার পুজোর আর একটি নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে বিসর্জনের দিনে। মণ্ডপের সামনেই প্রতিষ্ঠিত একটি পুকুরে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। নিরঞ্জনের দিন সিঁদুর খেলাও এখানকার বহুদিনের পরম্পরা। পাড়ার মহিলাদের উচ্ছ্বাস, ঢাকের বাদ্যি আর বিসর্জনের আবেগে শেষ হয় উৎসবের দিনগুলি। ডোমজুড়ের সরকার ব্রাদার্সের মোড় থেকে টোটোয় মিনিট দশেকের পথ। সাপডাঙা মোড়ে নেমে আরও কিছুটা হাঁটা। তবে সেই পথও যেন পুজো পরিক্রমারই অংশ। দু’পাশে একের পর এক ছোট-বড় পুজোমণ্ডপ, ঢাকের আওয়াজ, আলোর ঝলকানি আর পাড়ার মানুষের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে পথটাই হয়ে ওঠে উৎসবের অংশ। এই গ্রামেই ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি দুর্গাপুজো। সেই ভিড়ে খাঁটোরা পঞ্চাননতলার ‘মায়াজাল’ দর্শনার্থীকে হয়তো থমকে দাঁড় করাবে। কিন্তু এই পুজোর আসল সৌন্দর্য মণ্ডপের পাঁচিল, মাকড়সার জাল কিংবা আলোর খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে পাড়ার ছেলেদের হাতে বাঁশ বাঁধায়, রাত জেগে মণ্ডপ তৈরির পরিশ্রমে, একসঙ্গে পরিকল্পনা করার আনন্দে এবং বিসর্জনের দিন চোখের কোণে জমে থাকা জলে। ১৭ বছর ধরে নিজেদের শ্রম, ভালোবাসা আর নিষ্ঠায় পুজোকে বড় করে তুলেছেন খাঁটোরার মানুষ। তাই এখানে দুর্গাপুজো মানে শুধু চার দিনের উৎসব নয়; এ যেন সারা বছরের অপেক্ষার পর আপনজনদের কাছে ফিরে আসা। মা আসেন, আলো জ্বলে, ঢাক বাজে, সিঁদুরে রাঙা হয় মুখ। তারপর একদিন মা চলেও যান। থেকে যায় স্মৃতি, বিসর্জনের বিষণ্ণতা আর পরের বছরের অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে খাঁটোরা পঞ্চাননতলার সবচেয়ে বড় ‘মায়াজাল’—যে মায়া একবার জড়িয়ে ধরলে ছেড়ে আসা যায়, কিন্তু মন থেকে কখনও ছেড়ে আসা যায় না।